নিউজ ডেস্ক:
কুমিল্লার রাজনীতির গত কয়েক দশকের ইতিহাসে তিনটি নাম বারবার আলোচনায় এসেছে—প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট আফজল খান, সাবেক সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার এবং কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মনিরুল হক সাক্কু।

তিনজনই দীর্ঘ সময় কুমিল্লার রাজনীতির মাঠে সক্রিয় ছিলেন। সময়ের পরিবর্তনে তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থানও বদলেছে। একজন প্রয়াত, একজন দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে, আরেকজন দলীয় বহিষ্কারাদেশের মধ্যেও স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছেন।
আফজল খান: একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি
বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট আফজল খান ছিলেন কুমিল্লা আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং কুমিল্লা সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২১ সালের ১৬ নভেম্বর ঢাকার একটি হাসপাতালে ৮২ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।

তাঁর মৃত্যুর পর কুমিল্লায় অনুষ্ঠিত জানাজায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতি ছিল। তাঁকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গার্ড অব অনারও দেওয়া হয়।
আফজল খানের সঙ্গে আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের রাজনৈতিক সম্পর্ক ও পরবর্তী বিরোধ কুমিল্লার রাজনীতির একটি বহুল আলোচিত অধ্যায়। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আশির দশক থেকেই তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি হয় এবং পরবর্তী সময়ে এই বিরোধ কুমিল্লার নির্বাচনী রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলেছে।
আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার: দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রভাব ও নতুন বাস্তবতা
আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চার মেয়াদ দায়িত্ব পালন করেন এবং কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন।কুমিল্লা নামে বিভাগ চাই সর্বপ্রথম তিনি বলেছিলেন।

আফজল খানের মৃত্যুর পরও দুই ধারার রাজনৈতিক প্রভাব কুমিল্লার বিভিন্ন নির্বাচনে দৃশ্যমান ছিল। ২০২৪ সালের কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মেয়র উপনির্বাচনেও আফজল-বাহার রাজনৈতিক ধারার প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়।
তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাহাউদ্দিন বাহারের রাজনৈতিক অবস্থায় বড় পরিবর্তন আসে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে আদালত তাঁর, তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেয়। পরবর্তী ২০২৬ সালের কয়েকটি প্রতিবেদনে তাঁকে দেশের বাইরে অবস্থানরত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাক্কু: মেয়র থেকে বহিষ্কৃত নেতা, তবু মাঠে
মনিরুল হক সাক্কুর রাজনৈতিক পথও কুমিল্লার রাজনীতিতে আলাদা অধ্যায় তৈরি করেছে। তিনি ২০০৫ সালে কুমিল্লা পৌরসভার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন এবং পরবর্তীতে ২০১২ ও ২০১৭ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হন। ২০১২ সালে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী আফজল খানকে এবং ২০১৭ সালে আফজল খানের মেয়ে আঞ্জুম সুলতানা সীমাকে পরাজিত করেন।
২০২২ সালের সিটি নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হওয়ায় বিএনপি তাঁকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করে। এরপরও তিনি স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেছেন। সাম্প্রতিক সময়েও তাঁকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে দেখা গেছে এবং দলীয় বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের প্রত্যাশার কথা তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন।
তিনজন, তিন পরিণতি
কুমিল্লার রাজনীতির এই তিন চরিত্রের রাজনৈতিক পথ শেষ পর্যন্ত তিন ভিন্ন বাস্তবতায় এসে দাঁড়িয়েছে।
আফজল খান জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে রাজনীতির মাঠ ছেড়েছেন মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। তাঁর শেষ বিদায়ে রাষ্ট্রীয় সম্মান ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতি তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের একটি দৃশ্যমান সমাপ্তি তৈরি করে।
আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার দীর্ঘ সময় সংসদীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকার পর ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা ও অভিযোগের বিষয়ও সংবাদে এসেছে, যেগুলো আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য।
আর মনিরুল হক সাক্কু দলীয় বহিষ্কারের মধ্যেও কুমিল্লার রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করছেন। তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে দলীয় সিদ্ধান্ত, আইনগত অবস্থান এবং স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর।
কুমিল্লার রাজনীতির এই তিন অধ্যায় তাই শুধু তিন ব্যক্তির গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দলীয় বিভাজন, ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি, নির্বাচন, রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং সময়ের সঙ্গে ক্ষমতার পালাবদলের ইতিহাস।
একজন চলে গেছেন ইতিহাসের পাতায়, একজন দেশের বাইরে থেকে রাজনৈতিক আলোচনায় আছেন, আরেকজন দলীয় পরিচয়ের বাইরে থেকেও মাঠে থাকার চেষ্টা করছেন। শেষ পর্যন্ত ইতিহাস তাঁদের মূল্যায়ন করবে তাঁদের বক্তব্যে নয়, বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের কর্ম, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক এবং সময়ের পরীক্ষায় ফলাফল।